এক আর্জেন্টাইন ভক্তের ডায়েরি থেকে (২০২২)

ইউফোরিয়ার জোয়ার নেমে ভাটা আসলে চারপাশ বড্ড পানশে ঠেকে। তখন দু’চোখ বন্ধ করে পেছনের দিকে তাকালে নানান ছবির কোলাজ দেখা যায়।
১৯৯৪- তুই খেলার বুঝিস না কিছুই। তোর বাপ বলে মুক্তিযোদ্ধা- মাসুদ রানা, তুইও বলিস মুক্তিযোদ্ধা- মাসুদ রানা। তোর বাপ বলে আর্জেন্টিনা- ম্যারাডোনা, তুইও বলিস তাই! তুই আসলে তোর বাপের মত হতে চাস। তুই শুধু শুনেছিস ম্যারাডোনাকে খেলতে দিবে না। তাই শুনে বিড়াল ছানার মত ম্যাও ম্যাও করে কাঁদিস। খাটের পাশের দেয়ালে তুই ম্যারাডোনা কাপে চুমু খাচ্ছে সেই ছবিখানা পত্রিকা থেকে কেটে আঠা দিয়ে সেঁটে ঘুমাস। কি বোকা রে তুই!
১৯৯৮- এখনও খেলা তুই বুঝিস না। একটু পাকা হয়েছিস অবশ্য । বাবার হাত ধরে এই প্রথম রঙিন টিভিতে খেলা দেখতে গেলি এক আংকেলের বাসায়। কি টকটকে কমলা জামা, আর ঐ যে আকাশী-শাদার দল, দেখলেই যাদের- তোর বুকে কাঁপন ধরে। তোর নতুন ম্যারাডোনা লাল কার্ড খেল, তুই হেরে কেঁদে ঘরে ফিরলি বাবার হাত ধরে।
২০০২- এবার তুমি ক্লাস এইটে। খেলাটা একটু আধটু ঘিলুতে ঢোকে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট কি এইবারেই পেয়েছিলে? সদ্য কিশোর, আবেগ তাই বেশি। আসল জীবনের স্বাদ না পাওয়া তোমার কাছে তাই এটুকুই মন খারাপ করে দেয়। বাতিগোলের কান্না তাই তোমার মনে আটকে যায়।
২০০৬- ঘরছাড়া হয়েছ তখন। বড় শহর, বড় আকাশ। বিশ্বকাপের সময় ঘরে ফিরলে। এবার তোমার দল ফেভারিট। দুর্দান্ত খেলছে দলটা। স্বপ্ন সত্যি হবে? বাবা বললেন এক মেসিয়ার কথা, তার তকমাও নতুন মারাদোনা। বাবার সাথে এবারই তোমার শেষ বিশ্বকাপ হবে জানলে কি অন্যরকম ভাবে দেখতে? ফিরে গিয়ে বাবাকে বলতে ইচ্ছে করে না যে লম্বা চুলের সেই প্রায় আমাদের বয়সী কিশোর কি মহীরুহ হয়ে গেছে এতদিনে? তোমার বাবার কথা মনে আছে তো? হার্ট অতোটা শক্ত ছিল না আর, টাইব্রেকার এলেই বাইরে চলে যেতেন। থাক সেসব কথা।
২০১০- ভার্সিটি লাইফ। কি শক্তি আর উদ্যম সেই তারুণ্যের। আজ কিছুটা বোঝা যায়। খেলাধুলার চক্করে পড়াই সবাই লাটে তুলে ফেললাম। মুড়ি চানাচুর মেখে গোপীবাগে তুমি চিৎকার করে গলা ফাটাও পাগলা ম্যারাডোনা আর শান্ত মেসির জন্যে। আবেগে সব হয়না, শিখে নিলে।
২০১৪- পাশ করে বেরিয়ে গেছেন, চাকরি করছেন, আপনি করেই বললাম। কর্পোরেট দুনিয়া বুঝতে কষ্ট হচ্ছে, ফুটবল বোঝাটা আগের চেয়ে ভালো। রুক্ষ বাস্তবতা কড়া নাড়ছে। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে এল দলটা। এবার কেমন স্বপ্ন ভঙ্গের তীব্রতা? এতো কাছে গিয়ে সব হারিয়ে ফেলা যায়? মন ভাঙ্গে, তবে আপনি এখন চাকুরে। আর ব্যাটা মানুষদের কান্না করতে নেই।
২০১৮- পাড়ি দিয়ে অন্য দেশ। কি রোবট হয়ে গেলেন আপনি? কোন ভাবালুতা নেই? দল এমনভাবে বাদ পড়ল। মেসির জন্যে নিশ্চয় খারাপ লেগেছিল আপনার? আপনার প্রিয় প্লেয়ার বলে কথা। যার জন্যে দিন রাত নেই, যখন শুরু হয় খেলা দেখতে বসে পড়েন আপনি। যেই জীবনের সাগরে আপনি কোন তল পান না, সেই আপনাকে প্রতি সপ্তাহে লোকটা টেনে ওঠায়, আর বলে, এবার খেলা দেখানো শুরু করি তাহলে?
২০২২- মানুষ জীবনে যতদিন বাঁচে, ব্যক্তিগত জীবন বাদে, এমন ইউফোরিয়া কতবার অনুভব করতে পারে? গোটা কয়েক বার হয়ত। ফুটবলের সাথে জীবন গুলিয়ে ফেললে বহু অসুবিধে, মন ভাঙবে, আশার ফোলানো বেলুন ফুটবে বারবার। তবু লেগে থাকলে, স্বপ্ন দেখাটা চালিয়ে গেলে, হয়তোবা, ফুটবল আপনাকে কয়েকটা মুহূর্ত দেবে যার সাথে আর কোন কিছুরই তুলনা চলে না। ঐটুকুই প্রাপ্তি।
শেষ করি তাহলে। ২০০৬ আর ২০২২ মিলে যায় কেন জানি বারবার। একদল তরুণ যারা ফেভারিটের তকমা নিয়ে এসে পারেনি, এবার তারাই বিজয়ের কারিগর। একটা প্রজন্ম যা করার কথা দিয়েছিল, আধপাকা চুল আর স্বপ্নালু চোখ নিয়ে তারা ফিরে এসেছে। এবার হয়েছে, দীর্ঘ রাত্রি দিনের অপেক্ষার অবসান। এভাবেও ফিরে আসা যায়?
Leave a comment